শিক্ষায় সংস্কৃতি

বিভিন্ন ভাষাভাষীর এই দেশের স্থানীয় সংস্কৃতিও বৈচিত্র্যের রঙে রঙিন। দেশকাল ভেদে মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তার নিজের সংস্কৃতি। এরমধ্যেই মানুষ খুঁজে পায় নিজের স্বতন্ত্র স্বত্ত্বাকে। সংস্কৃতি মানে শুধু মনোরঞ্জন নয়। আমাদের সমাজে সংস্কৃতির এক মৌলিক জায়গা রয়েছে। এরমধ্যে দিয়ে কোনও জনগোষ্ঠীর পারম্পরিক ঐতিহ্য, তাদের লোকাচার, বিশ্বাস, জ্ঞান, এসব প্রতিফলিত হয়। সংস্কৃতি চর্চায় বিকশিত হয় মানুষের চেতনা, নিজের শিকড়ের সঙ্গে গড়ে ওঠে তার আত্মিক যোগ।

মানুষের নিজস্ব এই সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সঙ্গে শিক্ষার নিবিড় যোগ রয়েছে। উচ্চ নৈতিকতা সম্পন্ন মূল্যবোধ আর নিজের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল কোনও মন সহজেই আত্মস্থ করতে পারে আদর্শ শিক্ষার পাঠ। যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমরা নিজের শিকড়কে উপেক্ষা না করেও আধুনিক চিন্তায় নিমগ্ন থাকতে পারি। জগতের সামনে নিজেদেরকে সময়োপযোগী, আধুনিক চেতনার, প্রগতিশীল উন্নত মননের একজন মানুষ হিসাবে মেলে ধরা যায়।

শিক্ষার দর্শন
যে ভাবনা নিয়ে আমরা পথ চলা শুর করেছি তার মূল ভিত্তি কিন্তু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষা-দর্শন। আজ থেকে অনেক বছর আগে শিক্ষায় নবদিশা দেখিয়েছিলেন তিনি। তাঁর হাত ধরে একসময় যাত্রা শুরু করেছিল শ্রীনিকেতন, নতুন শিক্ষা-ভাবনার অনন্য এক পীঠস্থান। শুধু তাই নয়, তাঁর উদ্যোগেই প্রসার লাভ করে শান্তিনিকেতনও। পরে গোটা বিশ্বে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। তিনিই শিখিয়েছিলেন, প্রথাগত শিক্ষাকে স্কুলের চার দেওয়ালের বাইরে এনে কীভাবে তাকে জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে আরও আনন্দদায়ক করে তোলা যায়। তাঁর শিক্ষা-দর্শনে জায়গা পেয়েছিল হাতে-কলমে শিক্ষা। পাশাপাশি জীবন উপযোগী কর্মমূলক পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে তিনি আশ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিরও ব্যবস্থা করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে অনেকবার কবিগুরুর এই শিক্ষা-ভাবনার উপযোগীতা দেশের শিক্ষানীতি নির্ধারকদের আলোচনায় উঠে এসেছে। কিন্তু প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থাকে কখনও সেভাবে ভাবা হয়নি। আজ অনেক বছর পর, ২০০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই শিক্ষা-দর্শন জায়গা পেয়েছে জাতীয় পাঠক্রম রূপরেখায়। নতুন করে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে হাতে-কলমে, আনন্দদায়ক শিক্ষার উপর। এই জাতীয় পাঠক্রম রূপরেখায় খুব সুস্পষ্টভাবে শিক্ষার প্রসারে স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের ভূমিকার কথাও উল্লেখ রয়েছে। এই শিক্ষা-ভাবনা অনুসরণ করে আমরাও নতুন দিশার সন্ধানে পথ চলতে আরম্ভ করি।
সমাধানের খোঁজে
নবদিশার পথে চলতে চলতে আমরা উপলব্ধি করেছি, শৈশব থেকে গ্রাম-বাংলার ছেলেমেয়েরা যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে উঠছে তাতে না আছে কোনও আনন্দ, না আছে স্থানীয় জ্ঞান নির্ভর হাতে-কলমে প্রাসঙ্গিক শিক্ষার ব্যবস্থা। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যে সমস্ত বিষয় পড়ছে তার মধ্যে অনেক কিছুর সঙ্গেই তাদের আঞ্চলিক জীবনের কোনও মিল নেই। অনেকক্ষেত্রেই তাদের মধ্যে গ্রামীণ সংস্কৃতির পরিপন্থী এক মূল্যবোধ তৈরি হচ্ছে। বাড়ছে স্কুলছুটের সংখ্যা। বর্তমান এই পরিস্থিতি গ্রাম বাংলার চিরাচরিত ঐতিহ্য এবং সেখানকার আগামী প্রজন্মের পক্ষে এক ভয়ঙ্কর বিপদ। এই বিপদের আশঙ্কায় আজ আমরাও শঙ্কিত।
নবদিশার পথে তাই আমরা পাঠ্যপুস্তক নির্ভর শিক্ষাকে তার আঞ্চলিক জীবনযাপনের সঙ্গে সংযুক্ত করে সেই শিখন প্রক্রিয়াকে পরিবার ও সমাজের সহায়তায় এবং স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সুস্থায়ী করে তুলতে প্রয়াসী হয়েছি। ব্রতী হয়েছি ভয়হীন এক উন্মুক্ত শিক্ষার সন্ধানে।
নতুন দিশার নতুন উদ্যোগ
গ্রাম বাংলার শিক্ষাঙ্গনে যে শিখন প্রক্রিয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে আমরা পথ চলছি, তা বাস্তবায়নের জন্য গ্রামের সরকারি প্রাথমিক ও উচ্চ-প্রাথমিক, শিশু শিক্ষা কেন্দ্র ও মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্রগুলিতে ছাত্রছাত্রীদের সচেতনতার জন্য শিক্ষামূলক অডিও-ভিস্যুয়াল শো-এর পাশাপাশি আঞ্চলিক সংস্কৃতি চর্চারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পঞ্চায়েত চিহ্নিত স্থানীয় দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সহায়তায় সপ্তাহে এক থেকে দু’ঘন্টা পড়ুয়াদের জন্য নাচ, গান, নাটক, যাত্রা, অঙ্কন চর্চার ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া শরীরচর্চার জন্য খেলাধূলা, পাঠ্যপুস্তক নির্ভর হাতে-কলমে শিক্ষার জন্য স্কুলে স্কুলে চলছে বীজ পরিচিতি, গাছপালা ও তার পাতা চেনা, শাক-সবজি পরিচিতি, পুষ্টি বাগান, নার্সারী তৈরি ও আরও কত কিছু। কোথাও বাঁশের কাজ, কোথাও মাটির কাজ, কোথাও শোলার কাজ, কোথাও বা কাগজের কাজ, এমনই অনেক কিছু। ছেলেমেয়েদের ব্যবহারিক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্য সম্বন্ধীয় অন্যান্য বিষয়ে সচেতন করার পাশাপাশি শেখানো হচ্ছে প্রাথমিক চিকিৎসায় ভেষজ ওষুধের ব্যবহার।

বছরে একবার গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার সব স্কুলগুলিকে নিয়ে আয়োজন করা হয় সৃজন মেলার। যেখানে ছাত্রছাত্রীরা তাদের সৃজন প্রতিভাকে সকলের সামনে মেলে ধরার সুযোগ পায়। দিনভর চলে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পঞ্চায়েতের উদ্যোগে স্কুলে শিক্ষামূলক ভ্রমণের ব্যবস্থাও করা হয়। যাতে ছাত্রছাত্রীরা স্থনীয় কৃষিকাজ, পঞ্চায়েত ব্যবস্থা থেকে শুরু করে এলাকার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক স্থান পরিদর্শন করে তা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করতে পারে। পাশাপাশি গ্রীষ্ম বা পুজোর সময়, স্কুল যখন ছুটি থাকে তখনও থেমে থাকে না এইসব উদ্যোগ। স্কুলে পঠন-পাঠন বন্ধ থাকলেও, মাঝেমধ্যেই বসে সৃজনশীল আনন্দের আসর। আমাদের প্রয়াস থাকে এসব কাজ যেন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক ও গ্রাম শিক্ষা কমিটির সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিকভাবে গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে বাস্তবায়িত হয়। স্কুলে স্কুলে এইসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে আয়োজন করা হয় শিক্ষা বিষয়ক আঞ্চলিক কর্মশালার। এই শিক্ষা-দর্শন ধীরে ধীরে যাতে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়ে তারজন্য প্রয়োজনে ব্লকস্তরেও এধরনের কর্মশালা করা হয়। এক্ষেত্রে আমাদের ‘নবদিশা’ পত্রিকাকে ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে ভাবা হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্ট সকলকে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা যায়।

এই উদ্যোগে ভাবা হয়েছে গ্রামের স্কুলছুট যুবক-যুবতীদের কথাও। চাষবাসের পাশাপাশি তাদের জন্য স্থানীয় কর্মভিত্তিক বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। যাতে গ্রাম ছেড়ে তাদের অন্যত্র পাড়ি দিতে না হয়। গ্রামে থেকেই অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদকে ব্যবহার করে কিছু বাড়তি অর্থ উপার্জন করতে পারে।