শিক্ষায় পঞ্চায়েত

“বিকেন্দ্রীকরণ”, এই শব্দই হল পঞ্চায়েতীরাজ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানুষের মতামত, সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার। এক কথায় এই ব্যবস্থার মাধ্যমে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে উন্নয়নের চাবিকাঠি। কিন্তু এই বিকেন্দ্রীকৃত ব্যবস্থাকে বাস্তবে প্রয়োগ না করে শিক্ষাকে যদি সমাজ ও পরিবার থেকে কিংবা গ্রামের স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান এবং জনগোষ্ঠী থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় তবে চার দেওয়ালের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে থাকবে সেই শিক্ষা। বহির্জগতের সঙ্গে কোনও সংযোগই গড়ে উঠবে না।

আমরা মনে করি, সঠিক শিক্ষার মাধ্যমেই মানুষ দৈনন্দিন জীবনে তার বুদ্ধিকে সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারে। দুঃখের বিষয় হল, জীবনে শিক্ষার আলো কতটা জরুরি তা নিয়ে আজও আমাদের গ্রামাঞ্চলের একটা বিরাট অংশের মানুষের কোনও স্বচ্ছ ধারণা নেই। আবার উন্টোদিকে শিক্ষাঙ্গনের পরিকাঠামো নিয়ে যতটা চিন্তা-ভাবনা হয়, তার সিকিভাগও পাঠক্রম নিয়ে হয় না।

আমাদের স্থির বিশ্বাস, শিক্ষা কোনও বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। পরিবার, সমাজ ও তার জনগোষ্ঠী এবং সেই অঞ্চলের চাহিদার ভিত্তিতেই শিক্ষার বিষয়বস্তু স্থির করা দরকার। শুধু তাই নয়, এক্ষেত্রে স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানেরও একটা ইতিবাচক ভূমিকা থাকা দরকার। আমাদের রাজ্যের গ্রামাঞ্চলের সমাজও বিভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য নিয়ে তৈরি। সেই সমাজের আঞ্চলিক জ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি প্রভৃতিকে সেখানকার পাঠক্রমে রাখা দরকার।

২০০৫ সালে এদেশের জাতীয় পাঠক্রম রূপরেখা ও পরবর্তীতে রাজ্যের পাঠক্রমেও স্থানীয় কৃষ্টি, সংস্কৃতি, জ্ঞান এবং দক্ষতার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে সর্বশক্তি নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ স্থানীয় পাঠক্রম স্থির করার ক্ষেত্রে স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা থাকা উচিত। গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার সঙ্গে পঞ্চায়েতের এই সেতুবন্ধন হলে স্কুলগুলো হয়ে উঠবে সকলের। স্কুলের সঙ্গে তার চারপাশের জনগোষ্ঠীর বা সমাজের বাকি অংশের একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হবে।
স্থানীয় প্রাসঙ্গিক শিক্ষা
নবদিশার ভাবনায় আমরা উপলব্ধি করতে পেরেছি, মানুষের জীবনে কোনও শিক্ষাই ততক্ষণ পর্যন্ত উপযোগী হতে পারে না যতক্ষণ না তা স্থানীয় জ্ঞান নির্ভর বা প্রাসঙ্গিক হয়। এজন্য পঞ্চায়েতের ভূমিকা অপরিহার্য। আমাদের অভিজ্ঞতায় আমরা দেখেছি, গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোতে গরিব, প্রান্তিক পরিবারের ছেলেমেয়েরাই বেশি আসে। কিন্তু ওই স্কুলগুলোর অধিকাংশ পাঠক্রম শহরকেন্দ্রিক। যা ওইসব পড়ুয়াদের কাছে একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। শুধু তাই নয়, গ্রামের চিরাচরিত সামাজিক অবস্থান, স্থানীয় আচার-আচরণ, বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গী এই ভোগসর্বস্ব অর্থনীতিতে শহরকেন্দ্রিক শিক্ষার দাপাদাপিতে আজ সিঁদুরে মেঘ দেখছে।

পৃথিবীর বহু বুদ্ধিজীবী আজ এই ভেবে চিন্তিত যে, আধুনিক শহুরে সমাজের উন্নত জীবনযাত্রার ঢেউ ক্রমেই গ্রামাঞ্চলের স্থানীয় আঞ্চলিক জ্ঞান, মূল্যবোধ ও এবং কৃষি সংস্কৃতিকে অক্ষুণ্ণ রাখার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এতে গ্রামীণ শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের হতাশা বাড়ছে। কারণ গ্রামে থেকেও যে শিক্ষায় তারা শিক্ষিত তাতে গ্রামীণ জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় স্থানীয় জ্ঞান ও দক্ষতা নির্ভর প্রাসঙ্গিক শিক্ষা তাদের নেই। এরফলে জীবন-জীবিকার স্বার্থে গ্রাম ছেড়ে শহরে পা বাড়াচ্ছেন তারা। কেউ সফল হচ্ছেন, অনেকেই হচ্ছেন না। বিফল হয়ে যারা গ্রামে ফিরছেন তাদের অবস্থা আরও করুণ।

গ্রামাঞ্চলের শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের অবস্থাই যদি এমন হয়, তাহলে যারা শুধু অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রথাগত আবশ্যিক শিক্ষা গ্রহণ করেছে তাদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। এক্ষেত্রে গ্রামীণ জীবিকা সহায়ক দক্ষতার প্রশিক্ষণই একমাত্র সমাধান। আমরা মনে করি, পরম্পরাগত গ্রামীণ ঐতিহ্যকে বজায় রেখে আঞ্চলিক জ্ঞান নির্ভর জীবন-দক্ষতাকে সেখানকার শিক্ষা পদ্ধতিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।