আনন্দে শেখা

কোনও কিছুতে আনন্দ পাওয়ার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সেই কাজে সফল হওয়ার সম্ভাবনা। যে, যে কাজে আনন্দ পায়, সে সেই কাজে ততটাই সফল হয়। জন্মের পর শিশুর প্রথম প্রথাগত শিক্ষা শুর হয় স্কুলে। কিন্তু ধীরে ধীরে দেখা যায়, বেশিরভাগ শিশুর কাছে স্কুল এক ভীতির কারণ হয়ে ওঠে। আসলে চার দেওয়ালের নিরানন্দ পাঠ তার মধ্যে একঘেয়েমির জন্ম দেয়। যা আনন্দদায়ক শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এই রুক্ষ মরুভূমিতে এক টুকরো মরুদ্যান তৈরির উদ্দেশ্যে গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন পঞ্চায়েতের উদ্যোগে স্কুলে স্কুলে চলছে এলসিডি শো। যেখানে বিভিন্ন শিক্ষামূলক ও সচেতনতামূলক ছবি দেখানো হয়। পরে তা নিয়ে চলে আলোচনা। এরমধ্যে দিয়ে শুধু যে তারা আনন্দ পায় তাই নয়, বিকাশ ঘটে তাদের বোধের। বিভিন্ন কর্মভিত্তিক পাঠের মাধ্যমে বইয়ের বিষয়বস্তুকে হাতে-কলমে প্রত্যক্ষ করে তাকে সহজভাবে আত্মস্থ করার সুযোগ পায় ছাত্রছাত্রীরা। এছাড়া সৃজনমূলক প্রতিভা বিকাশের জন্য স্থানীয় অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যক্তিদের সহায়তায় স্কুলে স্কুলে নাচ-গান, লোকসংগীত, গল্প, কবিতা, নাটক, যাত্রা, ছবি আঁকা ইত্যাদি নানান বিষয় চর্চার ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসা গ্রামাঞ্চলের স্থানীয় কৃষ্টির কথা মাথায় রেখে তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে গ্রাম পঞ্চায়েত।

গ্রীষ্মকালীন ছুটির সময়টাকে যাতে ছাত্রছাত্রীরা যথাযথভাবে ব্যবহার করে নতুন কিছু শিখতে ও জানতে পারে, ভাবা হয়েছে সেই কথাও। এক্ষেত্রে স্থানীয় ঐতিহ্যপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক জায়গাগুলো ভ্রমণ, মুখোশ তৈরির প্রশিক্ষণ বা নাটক প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
শুধু জীবনের "তথাকথিত" সাফল্য নয়, একজন শিক্ষার্থী কী শিখল সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনও শিশু যদি জীবনের সঠিক দিশা খুঁজে পায় অর্থাৎ নিজের আগ্রহের জায়গাটা বুঝতে পারে তবে তার কাছে তাই হয়ে উঠবে সত্যিকারের আনন্দদায়ক শিক্ষা।
সৃজনের বিকাশে
নিজস্ব সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি শৈশব থেকেই শিশুদের সৃজন প্রতিভাকে বিকশিত করা প্রয়োজন। এরফলে একদিকে সে যেমন শিকড়ের টান অনুভব করতে শিখবে, তেমনই তার মননে জায়গা করে নেবে সৃষ্টির উদ্দীপনা। নবদিশার পথে তাই আমাদের প্রয়াস থাকে, গ্রামাঞ্চলের ক্ষুদে পড়ুয়ারা তাদের নিজ নিজ স্কুলেই যেন সৃজন প্রতিভাকে শাণিত করার একটা সুযোগ পায়। সে কারণেই গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে সেখানকার স্কুলগুলোতে বছরভর চলছে নাচ, গান, কবিতা পাঠ, স্থানীয় লোকসংগীত, নাটক, ছবি আঁকা, এমন নানান কিছু শিখনের আসর। পাশাপাশি স্থানীয় জ্ঞান নির্ভর দক্ষতারও পাঠ দেওয়া হচ্ছে তাদেরকে। কোথাও চলছে শোলা দিয়ে বিভিন্ন জিনিস বানানোর প্রশিক্ষণ, কোথাও মাটির, কোথাও কাগজের, কোথাও বাঁশের তো কোথাও মুখোশ তৈরির প্রশিক্ষণ। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহায়তায় গ্রামের দক্ষ যুবক-যুবতীরাই স্কুলে স্কুলে এইসব শেখাচ্ছেন।
সৃজন উৎসব

সৃজনের বিকাশে স্কুলে স্কুলে এই উদ্যোগ চলতে থাকার পাশাপাশি ব্যবস্থা করা হয় ক্ষুদে পড়ুয়াদের বিভিন্ন সৃজন প্রতিভাকে মেলে ধরারও, আয়োজন করা হয় স্কুল ভিত্তিক সৃজন উৎসবের।

প্রদর্শিত হয় তাদের আঁকা ছবি, বিভিন্ন হাতের কাজ। কেউ নাচছে, কেউ বলছে ছড়া বা কবিতা, কেউ আবার গাইছে গান, এমনই আরও কত কী। এভাবেই শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সহায়তায় নিত্যদিনের পড়াশোনার বাইরে বেরিয়ে এসে নিজেদের সহজাত বা অর্জিত প্রতিভাকে স্কুলের স্বল্প পরিসরে তারা অভিভাবক ও উপস্থিত গ্রামবাসীর সামনে তুলে ধরে। প্রশংসার করতালিতে মুখরিত হয়ে ওঠে শ্রেণিকক্ষ। অনাবিল আনন্দ, নতুন উদ্যম আর আত্মবিশ্বাস ফুটে ওঠে ছোট ছোট ছাত্রছাত্রীদের চোখেমুখে।

সৃজন মেলা

সারা বছর ধরে স্কুলে ছাত্রছাত্রীরা সৃজনমূলক যে সমস্ত কাজকর্ম শিখছে বছর শেষে গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে আয়োজিত সৃজনমেলায় মেলে ধরে তাদের সেই প্রতিভাকে।

সকাল সকাল স্কুলের পোশাক পড়ে শিক্ষক-শিক্ষিদের সঙ্গে মেলা প্রাঙ্গনে ভিড় জমায় উৎসাহী ছাত্রছাত্রীরা। স্কুলের জন্য নির্দিষ্ট স্টলটিকে নিজেদের হাতে সাজিয়ে তোলে তারা। স্টলে স্টলে স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের দেখভালে গড়ে ওঠা পুষ্টি বাগানের শাক-সবজি ছাড়াও দেখা মেলে তাদের নানান সৃজন প্রতিভার। কোথাও তাদের তৈরি মাটির কাজ, কোথাও শোলার, কোথাও বাঁশের, কোথাও বা কাগজ দিয়ে তৈরি নানান জিনিসের। মেলার মঞ্চে দিনভর চলে নাচ, গান, কবিতা-আবৃত্তি, নাটক আরও কত কী। মেলা শেষে উপস্থিত অতিথিদের হাত দিয়ে গ্রাম পঞ্চায়েতের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করা সেরা স্কুলকে।

নবদিশার পথে আমরা বিশ্বাস করি, সৃজনের বিকাশের পাশাপাশি তাকে সকলের সামনে মেলে ধরাটাও খুবই জরুরি। দর্শকের বাহবা আর করতালিতে শিল্পী আরও অনুপ্রাণিত হয়, সদা জাগ্রত থাকে তার শিল্পীসত্ত্বা। তাই স্কুলগুলোকে নিয়ে পঞ্চায়েত স্তরে অভিনব এই মেলা আয়োজনের ভাবনা।