সৃজাঙ্গন
অতীতে বাংলার গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের চর্চার আসর বসত। গ্রামেরই কোনও আটচালা বা মন্দির প্রাঙ্গনে বসত এই আসর। এখান থেকেই উঠে আসত বিভিন্ন সৃজন প্রতিভা, নানান দক্ষতা। গ্রামীণ সমাজে যারা শিল্পী হিসাবে সমাদৃত হতেন, গ্রামে যাদের আলাদা মর্যাদা ছিল। এই আসরে চর্চা হত বিভিন্ন মাধ্যম নিয়ে। যেমন যাত্রা, কবিগান, লোকনৃত্য, লোকগান, পটকথা, বিভিন্ন হাতের কাজ যেমন নকশা করা মাটির হাড়ি, বাঁশের কাজ, শোলার কাজ, নকসী কাঁথা ইত্যাদি। অর্থাৎ জীবনযাপন ও আনন্দের জন্য এই কাজগুলি ছিল সমাজের একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। পাশাপাশি জীবিকার জন্য সেখানে চর্চা হত চাষবাস নিয়েও। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রামের মানুষের পারস্পরিক আত্মিকতা আরও দৃঢ় হত। সব মিলিয়ে গ্রামের মানুষের কাছে এই ব্যবস্থা ছিল জীবন-শিক্ষার এক অনন্য আসর। আজ আর গ্রামে এই ব্যবস্থার দেখা মেলে না। আজকের সময়ে যা লুপ্ত হওয়ার পথে, গ্রামের মানুষের কাছে সৃজন চর্চার পরিসর ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে।

গ্রামের নেহাতই ছাপোষা একটা স্কুল। দিনের শেষ ক্লাসটা হতে না হতেই আর পাঁচটা স্কুলের মতো এখানেও ঢং ঢং শব্দে বেজে ওঠে ছুটির ঘণ্টা। ঘণ্টা বাজতেই ক্লাসঘর থেকে বইপত্র গুছিয়ে একছুটে বাইরে বেড়িয়ে আসে ক্ষুদে পড়ুয়ার দল। নিমেষের মধ্যে দিনের মতো মিলিয়ে যায় যাবতীয় ব্যস্ততা, এক নিস্তব্ধতা গ্রাস করে নেয় গোটা স্কুলটাকে।

এতো গেল, গ্রামের স্কুলগুলোর রোজকার ছবি, কিন্তু কেমন আছে গ্রামের সেইসব যুবক-যুবতীরা? যারা হয়তো একদিন এরকমই কোনও স্কুলে পড়ত। এরা সকলেই আজ মাধ্যমিক অনুত্তীর্ণ, কেউ আবার পার করতে পারেনি অষ্টম শ্রেণির গণ্ডিও। যে কোনও কারণেই পড়া শেষ না করতে পেরে এরা এখন বয়ে চলেছে স্কুলছুটের তকমা। নিয়মের কারণে অনেকক্ষেত্রেই তারা বঞ্চিত থেকে যায় বিভিন্ন সরকারি প্রশিক্ষণের সুযোগ থেকে। তাই সময়োপযোগী প্রয়োজনীয় গ্রামীণ দক্ষতার অভাবে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে চালিয়ে যাচ্ছে এক অসম লড়াই। জীবিকার সন্ধানে অনেক সময় নিজের গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে অন্য কোথাও। কেউ পথভ্রষ্ট হচ্ছেন, কেউ আবার সম্মুখীন হচ্ছেন নানান অজানা বিপদের। কে দাঁড়াবে এদের পাশে, কে এদেরকে আবার গ্রামীণ জীবনের মূল স্রোতের সঙ্গে জুড়বে?

এমন যদি একটা জায়গা গ্রামের মধ্যেই থাকত, যেখানে গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে স্থানীয় শিক্ষা-প্রশাসকদের সহায়তায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ ওই ধরনের যুবক-যুবতীদের জন্য কিছু করার কথা ভাবা যেতে পারে। গ্রামে থেকেই তারা যাতে নতুন কোনও দক্ষতা অর্জন করে তাদের জীবন-জীবিকার স্বার্থে কিছুটা বাড়তি আয় করতে পারে। আর একাজের জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গা হতে পারে ছুটির পর গ্রামেরই প্রাথমিক, উচ্চ প্রাথমিক বা কোনও মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র। যেখানে দু-তিন ঘণ্টার জন্য নার্সারী, অ্যাজোলা, ভার্মিকম্পোস্ট, অন্যান্য জৈব ও তরল সার তৈরি, কাটিং-গ্রাফটিং প্রশিক্ষণ, বীজ সংরক্ষণ, বীজ শোধন, প্রাণী পালন, মৎস্য চাষ ইত্যাদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এছাড়া দক্ষতা বৃদ্ধির এই আয়োজনে জায়গা করে নিতে পারে সৃজনমূলক বিভিন্ন কাজও। যা কিনা আনন্দের পাশাপাশি তাদেরকে আর্থিকভাবে আরও খানিকটা সাবলম্বী করে তুলতে পারে।